কোথায় হারিয়ে গেলেন শৈশব মাতানো হাসান/ARK?

মিউজিক ক্যাফে 15th Nov 18 at 2:41am 1,000
Googleplus Pint
কোথায় হারিয়ে গেলেন শৈশব মাতানো হাসান/ARK?

আজকাল এক ধরণের বিষণ্ণতায় ভুগছি। কোনো কিছুই ঠিক আগের মতো নেই। যেই আনন্দ নিয়ে আমরা সময়গুলো কাটিয়ে এসেছি, সেই আনন্দগুলো এখন স্মৃতি হয়ে আছে শুধু। আজ রেডিও শুনছি, হঠাৎ করে হাসানের একটা গান শুনতেই মনে হলো, আচ্ছা হাসান কোথায় আছেন এখন?

হাসান মানে আর্ক ব্যান্ডের সেই কিংবদন্তি হাসান। খুব অদ্ভুত লাগে, মানুষটার গান প্রায়ই শুনি কিন্তু এখন খেয়াল করলাম তাকে আগের মতো দেখি না কোথাও। কোথায় এখন এই মানুষটা?

ব্যান্ড হিসেবে আর্কের শুরু আরেকটু পরে। ১৯৯১ সালে। চাইম ব্যান্ড থেকে বেরিয়ে গুণী মিউজিশিয়ান আশিকুজ্জামান টুলু সে বছর শুরু করেছিলেন আর্ক ব্যান্ডটি। প্রথম দিকে অবশ্য ছিলেন না, এই ব্যান্ড দিয়েই মানুষের অন্তরে পৌঁছে যাওয়া শিল্পী হাসান৷ তিনি যোগ দিয়েছিলেন আর্কের প্রথম অ্যালবাম রিলিজ হওয়ার পর। বন্ধু পঞ্চম তাকে পরিচয় করিয়ে দেন আশিকুজ্জামান টুলুর সাথে। তিনিই হাসানকে সুযোগ দেন ব্যান্ডে। ব্যান্ডের বেশ কিছু সদস্য চলে যাওয়ায় হাসান আসবার পর নতুন একটা লাইনআপ দাঁড়ায়। এই নতুন লাইনআপ ১৯৯৬ সালে প্রকাশ করে তাজমহল অ্যালবামটি। রিলিজের পর পরই যেন একটা ঝড়ের সৃষ্টি হলো। তুমুল ভালবাসার জোয়ারে ভাসলো আর্কের তাজমহল অ্যালবাম। পাড়া মহল্লায় সব জায়গায় বাজতে থাকলো দিনের পর দিন এই গানগুলো।

বিখ্যাত ‘সুইটি’ গান যা হাসান প্রায় সব লাইভ শোতেই গেয়ে থাকেন, এই গানটি ছিল সেই তাজমহল অ্যালবামের। সেই নব্বই দশকটা তো ব্যান্ডদলগুলোর এক সোনালী সময়৷ সেই সময়ে আর্ক যেন নতুন মাত্রা যোগ করলো। আর লোকে অবাক হয়ে পরিচিত হলো এক অসাধারণ প্রতিভা হাসানের সাথে। হাই পিচে তিনি যতটা দূর্দান্ত ভোকাল, একই সাথে লো পিচেও অতটাই মোলায়েম। এই অদ্ভুত কম্বিনেশনের ভোকাল বাংলাদেশ খুব একটা পায়নি। তারচেয়ে বড় ব্যাপার, হাসানের মধ্যে অনেকে মাইকেল জ্যাকসনের একটা প্রভাব আবিষ্কার করলো। তিনি যে ভঙ্গিতে গান গান, তার পোষাক, লম্বা কালো চুল, মাথায় কালো হ্যাট, চোখে কাল চশমা সব মিলিয়ে একটা মিল খোঁজার চেষ্টা অমূলকও নয়। হাসান বেশ ভাল ইংরেজি গানও গাইতেন। এমনকি, আর্ক ব্যান্ডের তাজমহল এলবাম রিলিজের আগে তিনি ইংরেজি গানই কভার করে বেড়াতেন বিভিন্ন শোয়ে৷ তিনিও নিজেও মাইকেল জ্যাকসনের ভক্ত, তবে তিনি নিজেকে স্বতন্ত্রই ভাবেন।

হাসানের পুরো নাম সৈয়দ হাসানুর রহমান। গানের তালিম নেননি কোথাও তবুও তাকে বলা হয় তিনিই নাকি বাংলাদেশের সেই বিরল ভোকালিস্ট যিনি ছয়টা স্কেলে গান গাইতে পারতেন। তার গান আশ্চর্যজনকভাবে কলকাতায়ও ভীষণ জনপ্রিয় হয়৷ হাসানের ‘অভিমান নয়, কিছুটা অভিযোগ নিয়ে…’ গানটা কলকাতায় অনেক চলেছে সেইসময়। এমন উন্মাদনা একজন বাংলাদেশি শিল্পীকে নিয়ে হবে, সেটা কে ভেবেছে!

নব্বই দশকের শেষদিকে হাসানের জনপ্রিয়তা এত তুঙ্গে ছিল যে, তিনি সেই সময় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া শিল্পী ছিলেন। সেই সময় আইয়ুব বাচ্চু, জেমসের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতো হাসানের গান।

তখনকার ঈদের সময়টা ছিল ভীষণ আরাধ্য, প্রথমত ইত্যাদি অনুষ্ঠানের বিশেষ পর্ব হত। আরো একটা ব্যাপার ছিল। শুধু ব্যান্ড দলগুলো নিয়েই গানের শো হতো তখন। গান কতটাই বা বুঝতাম, কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে ব্যান্ডগুলোর বিচিত্রতা খুব মনে লাগত। একেকটা দলের একেকটা ধরণ। এখন এত কিছু আছে, আগের সেই টানটা আর নেই। এখন সবাই আছে, নেই ছোটবেলা মাতানো হাসানরা। তারা আছেন হয়ত, কিন্তু খানিকটা অন্তরালের মানুষ হয়ে গেছেন। এখন কোথাও দেখি না তাদের। শুধু প্লেলিস্টে তাদের কিছু গান আছে, মধ্যরাতের অস্থিরতায় এই গানগুলোই কেবল থেকে যায়।

বাংলাদেশের ব্যান্ড দলগুলোর প্রায় প্রত্যেকটা ভাঙ্গা গড়ার পর্বের মধ্য দিয়ে গেছে। অনেক ব্যান্ডের সদস্যরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের ব্যস্ততায় গানের জগত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অস্থিরতায় মাঝখানে একটা দীর্ঘসময় গানের লাইনে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এই সময়েই অনেক চেনা মুখ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করে। তাদের আর আগের মতো দেখা যায় না। ব্যান্ড সঙ্গীতেও ভাটার টান এসে পড়ে। ২০০২ সালের পর যেমন আর্ক বলতে গেলে দৃশ্যপট থেকে হারিয়েই যায়। ২০১০ সাল পর্যন্ত এই ব্যান্ডের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

আশিকুজ্জামান টুলু বিদেশ পাড়ি দেয়ার পর ব্যান্ডের দায়িত্ব পুরোপুরি এসে পড়ে তরুন শিল্পী হাসান আর লিড গিটারিস্ট পঞ্চমের কাঁধে। কিন্তু তাদের মধ্যে খানিকটা বিরোধের তৈরি হলে ২০০২ এর সেই সময়ে দুইজনই ব্যান্ড ছেড়ে দেন। হাসান ‘স্বাধীনতা’ নামে নতুন একটা ব্যান্ড গড়েন। তবে হাসান আবার ফিরে আসেন আর্কে, ২০১০ সালে। তারপর অ্যালবামের কাজ ধরেছেন, স্টেজ শো করেছেন কিছু কিন্তু তবুও আর্কের আগের সেই ক্রেজ চোখে পড়ে না৷ পুরনো গানগুলোই এখনো মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ফিরে আসে। এখনো বিষণ্ণ হয়ে উদাসী তরুণ সেই নব্বই দশকে গাওয়া হাসানের ‘যা রে উড়ে যা, পাখি ঘরে ফিরে যা..’ গায়।

হাসানকে নিয়ে একটি বেধনাদায়ক তথ্য ভাইরাল হয়েছিল, তিনি দুরারোগ্য পারকিনসন রোগে আক্রান্ত। এই খবরগুলো ভীষণ হার্ট ব্রেকিং আমাদের জন্য৷ যদিও আশার কথা হচ্ছে হাসান নিজেই জানিয়েছেন তিনি সুস্থ আছেন। অচিরেই গানে ফিরবেন। এলবাম প্রকাশ করবেন।

হাসান গান ছেড়ে দিয়েছেন এমন একটি কথা চাউর হয়েছিল। তবে এইবছরই এক সাক্ষাতকারে হাসান জানিয়েছেন, তিনি হারিয়ে যাননি। ফিরে আসছেন। বলেছেন, “আসলে গান আমি ছাড়িনি। হয়তো নতুন কোনো গান করছি না। কিন্তু গানের সঙ্গেই আছি। আমি একটা ধারা নিয়ে কাজ করেছি। যেটা আর্ক ব্যান্ডের মাধ্যমে হয়েছিল। এখনকার যুগে শ্রোতা চাহিদা অনেক পরিবর্তন। মিউজিক বিশ্বও এখন অনেক এগিয়ে গেছে। গানও কিন্তু সেভাবে তাল মিলিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার কথা আমাদের দেশে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে ৯০ দশকের সেই ব্যান্ড সঙ্গীতের ধারাটা আমরা আর ফিরিয়ে আনতে পারিনি। এখন আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা করা উচিত। এমন কিছু করব যা দর্শক-শ্রোতাদের আনন্দ দেবে। সে জন্য অনেকদিন ধরে কাজ করছি। অনেক নতুন কিছু শিখছি। শ্রোতাদের নতুন কিছু দেয়ার সময় এসেছে। শিগগিরই শ্রোতারা আমার গান পাবে।”

ক্যাসেটের যুগ নেই আজ। ক্যাসেটের ফিতা জট লেগে আছে শৈশবের স্মৃতিবিভ্রাটে। সিডির যুগও নেই৷ সিডি ঘুরে কিন্তু সিডি কিনে গান শুনার মানুষ কই এখন আর। তাই ক্যাসেট, সিডি নিয়ে যেমন এখন ক্রেজ নেই, নেই সেই যুগের সেই শিল্পীরাও। হাসান, বিপ্লব, জেমস আমাদের শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের জন্য আনন্দের কথা তারা এখনো বেঁচে আছেন, শুধু তাই নয় এখনো বাংলা গানকে, বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতকে অনেক কিছু দেয়ার আছে তাদের। তাই, তাদের হারিয়ে যাওয়া আমাদের পোড়ায় অনেক। তারা যেমন আশাবাদ শোনালেন ফিরে আসার, তেমনটা হলে নাইন্টিজ কিডদের চেয়ে বেশি খুশি আর কে হবে! ফিরে আসুন, হাসান হারিয়ে যাবেন না৷ হারিয়ে যাওয়া জরুরি খবর হোক, চাই না।

Googleplus Pint
Tanim Siam
Manager
Like - Dislike Votes 0 - Rating 0 of 10

পাঠকের মন্তব্য (0)